পরিচিতি

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রাচীন একটি জনপদের নাম রংপুর। শিক্ষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আন্দোলন সংগ্রামে রয়েছে এ জেলার গৌরবময় অতীত ভূমিকা। রংপুর পৌরসভা, রংপুর টাউন হল, কারমাইকেল কলেজ, রংপুর পাবলিক লাইব্রেরী, জিলা পরিষদ, শা্যামাসুন্দরী খাল, রংপুর জিলা স্কুল সহ আরও অনেক কীর্তিময় স্থাপনা রংপুর শহরের প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক। রংপুর শহরের প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৩২ সালে। পরবর্তীতে ১৮৬২ সালে তা রংপুর জিলা স্কুল।

বর্তমানে যা রংপুর টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ নামে পরিচিত এবং রংপুর পুলিশ লাইন্স এর সামনে অবস্থিত। ১৮৬৫ সালে রংপুরের জমিদারগণ রংপুর আর্টিজান স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে এটি অন্যতম প্রাচিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সমসাময়িককালে উপমহাদেশের কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে ছিল থমসন কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং (১৮৪৮), ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ পুনে, লাহোর, গোরকপুর যাদবপুর, শিবপুর, এবং ঢাকা সার্ভে স্কুল (১৮৭৬) যা বর্তমানে বুয়েট। এ হিসেবে রংপুর আর্টিজান স্কুলই বাংলাদেশের প্রথম কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধারণা করা হয়।

১৮৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত রংপুর আর্টিজান স্কুল নানা পরিবর্তন ও বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজকের রংপুর টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজে উপনীত হয়েছে। শুরুতে স্থানীয় জমিদারগণ স্কুলটি পরিচালনার জন্য এককালীন ৫০০ টাকার অনুদান এবং মাসিক ৬৫ টাকা বরাদ্দ করেন। ১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি সরকারি অনুমোদন লাভ করে এবং বছরে ৩০০ টাকা হারে অনুদান প্রাপ্ত হয়। তাজহাটের মহারাজা গোবিন্দলাল রায় প্রতিষ্ঠানটির জন্য ৪.৩৬ একর জমি দান করেন এবং একটি হিন্দু ছাত্রাবাস নির্মাণ করেন। ১৮৮৯ সালে তৎকালীন বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার স্টুয়ার্ট কলভিন বেইলি এ প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে এলে তাঁদের সম্মানার্থে প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করা হয় বেইলি গোবিন্দলাল টেকনিক্যাল স্কুল। এ সময় এখানে শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অধীনে ওভারসিয়ার, আমিনশীপ, আর্টিজান ও কৃষিকর্ম এ ৪টি বিভাগ খোলা হয়। ১৯০৭ সালে এ প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংখ্যা ছিল ৯৭ জন। যার মধ্যে ৬০ জন হিন্দু, ৩৩ জন মুসলমান এবং ৪ জন বৌদ্ধ। ১৯২০ সালে গভর্ণমেন্ট অব বেঙ্গল এর ডিপার্টমেন্ট অব ইন্ডাষ্ট্রি প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার দায়িত্ব পায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অস্ত্রপাতি মেরামতের জন্য এ প্রতিষ্ঠানের ওয়ার্কশপগুলো কিছু সময়ের জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল। পঞ্চাশের দশকে ফোর্জিং, কার্পেন্ট্রি কোর্স চালু হলে রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত ব্যবহারিক বিষয়ে অধ্যয়নের জন্য এ প্রতিষ্ঠানে সংযুক্ত থাকতেন। এ সুবাদে দেশের অনেক কৃতি সন্তানের পদচারনায় মুখরিত ছিল এ শিক্ষাঙ্গন। বিশিষ্ট পরমানু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া, জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান এবং আরও অনেক গুনীজন এ প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ছিলেন।

১৯৬২ সালে এখানে রংপুর পলিটেকনিক ইনষ্টিটিউট স্থাপিত হয় এবং নিয়মিত ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সের সাথে সংযুক্ত কোর্স হিসেবে ডিপ্লোমা ইন কমার্স কোর্স চালু হয়। এর সঙ্গে ইভিনিং শিফটে ২ বৎসর মেয়াদি ট্রেড কোর্স চালু ছিল। পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন জনাব মোঃ আব্দুল আজিজ। এ সময় ডাইরেক্টর ছিলেন জনাব ওয়াকার আহমেদ এবং ডিপ্লোমা ইন কমার্স কোর্স এর এ্যাডভাইজার ছিলেন মি: অটিস্কপি। ১৯৭৬ সালে পলিটেকনিক ইনষ্টিটিউট রংপুর শহরের জুম্মাপাড়ায় স্থানান্তর হয়।
১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠানটি ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এ রূপান্তরিত হয় এবং ২ বছর মেয়াদি ট্রেড কোর্স চালু থাকে। এর পাশাপাশি যুব মন্ত্রণালয়ের সান্ধ্যকালীন ৬ মাস মেয়াদী মডিউলার কোর্স চালু হয়। ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এর প্রথম সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে নিযুক্ত হন জনাব মোঃ মজিবর রহমান। তখন ৯ টি ট্রেডে ১৮০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। উল্লেখ্য ১৯৮৪ সালে এ প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ছিল জনশক্তি ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এ সময় এখানে ৬ মাস মেয়াদী মডিউলার কোর্স চালুর সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের দাবীর মুখে বন্ধ হয় এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ পুনরায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে চলে যায়। ১৯৯৭ সালে ডিপ্লোমা ইন কমার্স কোর্স পরিচালনাকারী গভ: কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউট আলাদা ক্যাম্পাস হিসেবে শহরের সেন্ট্রাল রোডে স্থানান্তর হয়।
দেশের ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটসমূহের শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল প্রচলিত সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ভোকেশনাল শিক্ষাব্যবস্থা প্রর্বতন করা। সরকার ১৯৯৫ সালে দেশের সকল ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এ এসএসসি (ভোকেশনাল) ও ১৯৯৭ সালে এইচএসসি (ভোকেশনাল) শিক্ষাক্রম চালু করে যা বর্তমানে অব্যাহত আছে। ২০০৩ সালে সরকার এক গেজেটের মাধ্যমে দেশের সকল ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটকে টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজে উন্নীত করে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির নাম হয় রংপুর টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ। এর প্রশাসনিক কার্যক্রম শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত এবং শিক্ষা কার্যক্রম বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড দ্বারা পরিচালিত।

Contact Us

We're not around right now. But you can send us an email and we'll get back to you, asap.

Not readable? Change text.